আমাদের একজন এন্ড্রু কিশোর ছিলেন : সাংবাদিক জীবন কৃষ্ণ দেবনাথ

এন্ড্রু কিশোর। ছবি: সংগৃহীত

দৈনিক আজকালের দর্পন ডেস্ক : গান নিয়েই ছিল তাঁর যত ব্যস্ততা। একটা নতুন গান করার জন্য উদগ্রীব থাকতেন। প্রচারণার জন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা নয়, গান করাটাকেই বড় কাজ বলে মানতেন তিনি। বিশ্বাস করতেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর কণ্ঠটাকেই মনে রাখবে মানুষ। তাঁর গায়কিই মানুষকে বাধ্য করবে তাঁর কাছে ছুটে আসতে। নিজের ওপর, শিল্পীসত্তার ওপর আত্মবিশ্বাসী থেকেছেন আমৃত্যু, যা তাঁকে করেছে অমর, দেশের চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক–সম্রাট। তিনি এন্ড্রু কিশোর। লো প্রোফাইলে থাকা হাই প্রোফাইল এক শিল্পী। ‘আমি চিরকাল প্রেমেরও কাঙাল’, নিজের গাওয়া এ গানের মতোই এন্ড্রু কিশোরের জীবন। গানের বিনিময়ে ভালোবাসা ছাড়া আর তেমন কিছু চাননি মানুষের কাছে। তাই অন্য কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করেনি। সমসাময়িক শিল্পীরা প্রচারের আলোয় যতটা ছিলেন, তার ছিটেফোঁটাতেও ছিলেন না তিনি। বরং কণ্ঠ দিয়েই সবাই চিনেছেন তাঁকে।

এন্ড্রু কিশোর। ছবি: সংগৃহীতসরাসরি গানের আয়োজনের নামে মধ্যরাত পর্যন্ত টেলিভিশনে যে অনুষ্ঠান চলে, সেসবে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না এন্ড্রু কিশোর। তাই টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন অনিয়মিত। জীবনের লম্বা সময়ের সহযাত্রী কুমার বিশ্বজিৎ মনে করেন, এন্ড্রু কিশোর হচ্ছেন লো প্রোফাইলে থাকা হাই প্রোফাইল একজন শিল্পী। প্রাপ্তি আর জনপ্রিয়তার চেয়ে তাঁর কণ্ঠের দ্যুতি ছিল অনেক বেশি। কুমার বিশ্বজিতের মতে, ‘এটা বোধ হয় তিনি নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন। সব সময় দেখেছি, খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। যার কারণে ১৫ বছরে টেলিভিশনেও কোনো গান করতে আসেননি। তখনকার সময়ে প্রচারের একটাই মাধ্যম ছিল, টেলিভিশন। অথচ তিনি বলতেন, “আমি অন্তরালের মানুষ, অন্তরালেই থাকব। পারলে কণ্ঠ দিয়ে সব জয় করব।” যদি বলা হয় নিয়মিত টেলিভিশনের পর্দায় ছিলেন, তা শুধু ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে। বন্ধুত্বের খাতিরে হানিফ সংকেতই তাঁকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের গানের বাইরে ইত্যাদির কারণে অনেকগুলো মৌলিক গানও তাঁর গানের ভান্ডারে জমা হয়েছিল।’

এন্ড্রু কিশোর। ছবি: সংগৃহীত
এন্ড্রু কিশোরের পেশাদার গানের জীবন শুরু হয় প্লেব্যাক দিয়ে। নিজেকে ক্যামেরার সামনে নিতে আগ্রহী ছিলেন না। তবে সতীর্থরা চাইতেন, যিনি ফিল্মে গান করেন, যাঁর গান হিট করে, তাঁর টেলিভিশনে যাওয়া উচিত। মুখ চেনানো উচিত। এ নিয়ে এন্ড্রু কিশোরের তৎপরতা ছিল না। তিনি বরং কণ্ঠ চিনিয়েছেন।

অনেক সুরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন কিশোর। অভিষেক যাঁর হাত ধরে, সেই সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খান বলেন, ‘এন্ড্রুর কণ্ঠই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রচারমাধ্যম। শ্রোতারা তাঁকে না দেখে, তাঁর কণ্ঠকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছে।’ হানিফ সংকেত মনে করেন, ‘কিশোর এমন এক প্রতিভা, যা মুখে বলার কিছু নাই। তাঁর গান বাঁচবে, কণ্ঠটা মানুষের হৃদয়ে থাকবে। তাঁকে বলতে হয়নি, আমি এন্ড্রু কিশোর। তাঁর কণ্ঠ বলে দিয়েছে, সে এন্ড্রু কিশোর, সে সবার চেয়ে আলাদা।’

যাঁকে নিয়ে এত মানুষের এত রকম মত, সেই এন্ড্রু কিশোর নিজেকে মনে করতেন কণ্ঠশ্রমিক। পাঁচ দশকের সংগীতজীবনে শ্রোতাপ্রিয় বহু গান উপহার দিয়েছেন তিনি। গানগুলোর সঙ্গে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তিনিও বেঁচে থাকবেন।

গত কয়েক দশক দেশের প্লেব্যাক সংগীত আর তাঁর নাম ছিল সমান্তরাল। তাই নামের পাশে ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ উপাধি যুক্ত হয়ে গিয়েছিল অঘোষিতভাবে। সেই এন্ড্রু কিশোর পিঞ্জর ভেঙে ডানা মেলে উড়াল দিলেন ওপারে। গত সোমবারের সন্ধ্যাটি ছিল বাংলা গানের জন্য বিষাদময়। এ বিষাদ শেষ হওয়ার নয়, এ ক্ষতি অপূরণীয়।

এন্ড্রু কিশোরকে নিয়ে সংগীতাঙ্গনের কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পী স্মৃতিচারণ করলেন।ছবি: প্রথম আলো

নন-হজকিন লিম্ফোমা নামের ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন এন্ড্রু কিশোর। গত ৯ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। সেখানে চিকিৎসাও চলছিল। দীর্ঘ ১০ মাস লড়াই করেছেন এই মারণব্যাধির সঙ্গে। কিন্তু মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো তাঁকে। তবে নিজের ইচ্ছাতেই দেশে ফিরতে চেয়েছেন। বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশে গিয়ে মরতে চাই, এখানে নয়।’ ১১ জুন সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরেন। নিজের শহর রাজশাহীর মহিষবাথান এলাকায় বোনের বাড়িতে শেষ হলো তাঁর জীবনের গল্প, পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিলেন।
উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান বলতেই, এন্ড্রু কিশোর আসবেন সবার আগে। দেশের আনাচকানাচে তরুণ অনেক শিল্পী তাঁর গায়কি অনুকরণ করতেন, তিনি ছিলেন যশপ্রার্থী শিল্পীদের আদর্শ। দেশের গণ্ডি পেরিয়েও কণ্ঠ দিয়েছেন বিদেশি গানে। আর ডি বর্মণ, যাঁকে পঞ্চম বলে জানেন সবাই, উপমহাদেশের বিখ্যাত এই সংগীত পরিচালকের পরিচালনায়ও গেয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে বিদায়ের গান গেয়েছেন অনেক, ‘জীবনের গল্প/ আছে বাকি অল্প’, ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, কিংবা ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’। গানের মতোই তিনিও জীবনের গল্প চুকিয়ে পাড়ি জমালেন ওপারে। তাঁকে নিয়ে সংগীতাঙ্গনের কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পী স্মৃতিচারণ করলেন।

খুরশীদ আলম। ছবি: প্রথম আলোখুরশীদ আলম। ছবি: প্রথম আলোদ্বিতীয় এন্ড্রু কিশোর আমরা পাব না
খুরশীদ আলম, সংগীতশিল্পী

সংগীতাঙ্গন বা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যা–ই বলি, এন্ড্রু কিশোর ছিল আমাদের দেশের সম্পদ। বড় মাপের একজন শিল্পীকে হারালাম। এমন মানুষ কিংবা গায়ক যা–ই আমরা বলি না কেন, আসলে আমরা মূল্যবান কিছু হারালাম। এন্ড্রু কিশোরের চেয়ে ভালো শিল্পী আসতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয় এন্ড্রু কিশোর আমরা পাব না। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে বহু গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর সঙ্গে গান গাইতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। সবশেষে যা–ই বলি, আমরা একজন গুণী মানুষকে হারালাম।

তাঁর প্রয়াণ আমার অঙ্গহানির মতো
হানিফ সংকেতের সঙ্গে। ছবি: ফেসবুক থেকেহানিফ সংকেত, উপস্থাপক ও নির্মাতা

এন্ড্রু কিশোর আমার প্রাণের বন্ধু ছিল। তাঁর প্রয়াণ আমার কাছে নিজের অঙ্গহানির মতো। একসঙ্গে দেশ ঘুরেছি। হাজারো স্মৃতি আমাদের। কোথাও অনুষ্ঠান করতে গেলে কখনো শিল্পীর মতো আচরণ করত না। মনে হতো ‘ইত্যাদি’র কর্মী। আমি তার দেখভাল কী করব, সে আমার দেখভাল শুরু করে দিত। তার বড় গুণটা হচ্ছে, কারও বদনাম করত না। জুনে দেশে ফিরে প্রথম ফোনটা সে আমাকে করেছিল। বলেছিল, ‘দোস্ত, আমার জার্নি শেষ, আই অ্যাম রেডি টু ফ্লাই। আসার দরকার নাই, তাতে কষ্ট কম পাবি।’

কুমার বিশ্বজিৎ বললেন, তিনি শুধু সহযাত্রী নন, আমার বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন। ছবি: প্রথম আলোকুআমার বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন
কুমার বিশ্বজিৎ, সংগীতশিল্পী

তিনি শুধু সহযাত্রী নন, আমার বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন। তিনি আমাকে যেমন আদর করতেন, তেমনি শাসনও করতেন। আমাদের এমন একটা সম্পর্ক ছিল, যেখানে সবকিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। দাদার বিয়ের গাড়ি সাজানো থেকে শুরু করে সব করেছি। কী বলব, আমাদের দুজনের সম্পর্ক খুবই গভীর ছিল। দুজন গাড়ি কিনেছি একসঙ্গে, আবার আমাদের বাসার ফার্নিচার বানাব—তা–ও একই রকম। অসংখ্য স্মৃতি আমাকে কাঁদাচ্ছে। আমরা একসঙ্গে অনেক গান করেছি। ভালো লাগছে, আমার সুরে কিশোর দাদা একটি গান করেছিলেন।

এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে অনেক দ্বৈত গান করেছেন কনকচাঁপা। ছবি: প্রথম আলোআমাদের একজন এন্ড্রু কিশোর ছিলেন
কনকচাঁপা, সংগীতশিল্পী

আমার খুব সৌভাগ্য, পেশাদার জীবনে যখনই চলচ্চিত্রের গান গাওয়া শুরু করেছি, এন্ড্রুদাকে পেয়েছি। তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁর গান গাওয়ার স্টাইল, দক্ষতা, ক্ষমতা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এটা আমার জীবনের অনেক বড় একটা পাওয়া। বাংলাদেশের গর্ব করা উচিত আমাদের একজন এন্ড্রু কিশোর ছিলেন। অনেকে বলতে পারেন, কিশোর কুমারের মতো গলা, আমি বলব এন্ড্রু কিশোর এন্ড্রু কিশোরই, তাঁর কণ্ঠটা আমার কাছে যেন গলিত সোনা। তাঁকে এত দ্রুত হারাব, ভাবতেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

শুধু গান নিয়েই একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন এন্ড্রু কিশোর। গানই ছিল তাঁর জীবন, গানই প্রাণ। গান তাঁর প্রাণে মিশে গেছে শৈশব থেকে। তখন তিনি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র।

নানা বয়সে এন্ড্রু কিশোর। ছবি: সংগৃহীত

মূলত গান শিখতেন বড় বোন ডা. মার্সেলা শিখা বিশ্বাস। ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছেই শিখতেন তিনি। বড় বোন যখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন, এন্ড্রু কিশোর চুপ করে বসে থাকতেন পাশে। তবলা বাজাতেন বড় ভাই। দুই বড় ভাইবোন হারমোনিয়াম–তবলা নিয়ে অনুশীলন করতেন। দিনের পর দিন এভাবে চলছিল। কিন্তু একসময় বড় দুজনকেই পাঠিয়ে দেওয়া হলো বরিশালে বোর্ডিং স্কুলে। এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এন্ড্রু কিশোর বলেছিলেন, ‘আমরা ছিলাম নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। একসঙ্গে তিন ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ চালানো খুব সমস্যা। এ কারণে দুই ভাইবোনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বোর্ডিং স্কুলে।’ দুই ভাইবোন বরিশালে যাওয়ার পর ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চু বাবাকে বললেন, তাহলে ছোট্ট এন্ড্রুকেই দিয়ে দেওয়া হোক গান শেখার জন্য।

আশির দশকে গানের অনুশীলনে। ছবি: সংগৃহীতআশির দশকে গানের অনুশীলনে। ছবি: সংগৃহীতবাবা সংগীতের মোটামুটি সমঝদার ছিলেন। তিনি হাসিমুখে রোজ সাইকেলে করে ছেলেকে সুরবাণী সংগীত বিদ্যালয়ে ওস্তাদজির কাছে গান শেখাতে নিয়ে যাওয়ার কাজটা খুব আগ্রহ নিয়েই করতে লাগলেন। ’৬৪ সালে এভাবেই সংগীতের হাতেখড়ি হয়েছিল এন্ড্রুর। এরপর মন দিয়ে শুধু দুটি জিনিসই করে যেতে হয়েছে তাঁকে—লেখাপড়া আর সংগীত।

গান আর লেখাপড়া সমানতালে চলছিল। কোনোটায় ছাড় দেননি এন্ড্রু। লেখাপড়া বলতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, সত্যিকারের মানুষ হওয়ার শিক্ষাটাও নিয়েছিলেন পারিবারিকভাবে। এভাবে অনার্স ফাইনালে। অনার্সের শেষ বর্ষে মৌখিক পরীক্ষা নিতে ঢাকার এক অধ্যাপক গেছেন। এন্ড্রুকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে রাজশাহী সিটি কলেজের অধ্যক্ষ খুব গর্বিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘এ হচ্ছে আমাদের ছাত্র। সিনেমায় গান গায়।’ শুনে অধ্যাপক বললেন, ‘বাহ, তাহলে ও মাস্টার্সটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই করুক। তাহলে ওর গানের জন্যও সুবিধা হবে।’

এন্ড্রু কিশোর। ছবি: প্রথম আলোএন্ড্রু কিশোর। ছবি: প্রথম আলোশিক্ষক প্রস্তাব দিলেন, ভালো সুযোগ বলা যায়। তবে কাজে লাগানো গেল না মায়ের জন্য। মা সব সময় বলতেন, ‘মাস্টার্স শেষ করার আগে আমি তোকে ছাড়ছি না।’ ফলে মাস্টার্সের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই ব্যবস্থাপনাতে ভর্তি হয়ে যেতে হলো এন্ড্রুকে। এ প্রসঙ্গে জীবনকালে স্মৃতিচারণায় এন্ড্রু বলেছিলেন, ‘মা আমাকে খুব ভালো একটা শিক্ষা দিয়েছেন জীবনে, তিনি শিখিয়েছিলেন, লেখাপড়াটা জীবনে খুব দরকারি জিনিস। শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, মনুষ্যত্বের শিক্ষাও। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতেও শিক্ষাটা আমার খুব কাজে এসেছে।’

যে বাড়িতে ফেরার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে এন্ড্রু কিশোর বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন। ছবি: প্রথম আলো

যে বাড়িতে ফেরার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে এন্ড্রু কিশোর বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন। তিনি এখন সেই বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি ছোট্ট কক্ষে শুয়ে আছেন। কক্ষটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। নাম হিমঘর। তাঁর দুই সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছেন। তাঁরা ফিরলে হিমঘর থেকে বের করা হবে, কিন্তু সেই বাড়িতে তাঁকে আর নেওয়া হবে না। যদিও বাড়িটা তাঁর নয়। কিন্তু এখন থেকে এ বাড়িই তাঁর ‘পরিচয়’ বহন করবে, স্মৃতি বহন করবে। বাড়িটা তাঁর বোনের।

এই শহরেই এন্ড্রু কিশোর জন্ম নিয়েছিলেন। বেড়ে ওঠা ও লেখাপড়াও এখানেই। তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল এই শহর। তবে নিজের কোনো বাড়ি নেই। পদ্মা আবাসিক এলাকায় বোনের সঙ্গে একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। সেটাও চিকিৎসার জন্য বিক্রি করে দিয়েছেন। রাজশাহীকে ছুঁয়ে দেখার জন্য এসেছিলেন তিনি। উঠেছিলেন বোনের বাড়িতে। এ বাড়িতেই তিনি পৃথিবীর বাতাসে শেষবার নিশ্বাস নিয়েছেন, ছেড়েছেন।

এন্ড্রু কিশোর। ছবি: প্রথম আলোএন্ড্রু কিশোর। ছবি: প্রথম আলোরাজশাহী নগরের মহিষবাথান এলাকায় অবস্থিত এ বাড়ির নিচতলায় এন্ড্রু কিশোরের বোন শিখা বিশ্বাস ও তাঁর স্বামী প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাসের একটি চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। আর ওপরের তলাগুলো আবাসিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গত ২০ জুন এন্ড্রু কিশোর ঢাকা থেকে এই বাসায় এসে ওঠেন। গণমাধ্যমে খবর সূত্রে রাজশাহীর মানুষ জানতেন, এই বাড়িতে প্লেব্যাক–সম্রাট এন্ড্রু কিশোর আছেন। কিন্তু করোনা–পরিস্থিতির কারণে শুভানুধ্যায়ীরা বাসায় তাঁকে দেখতে যেতে পারেননি। এ ব্যাপারে বাড়িতে কড়াকড়ি ছিল।

গত সোমবার সন্ধ্যার সময় বাড়িটার সামনে ভিড় জমে ওঠে। কেউ কাউকে ঠেকাতে চেষ্টা করেননি। কেউ বাধাও মানেননি। সবাই চেয়েছেন শেষবারের মতো সংগীতের বরপুত্রকে তাঁরা দেখতে চান। গোসল শেষে রাতেই এন্ড্রু কিশোরকে হিমঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সবাই একে একে সরে এলেন বাড়িটা থেকে। তবে এন্ড্রু কিশোর বাড়িটাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেলেন। এখন রাজশাহী শহরের চেনা কোনো মানুষ এই বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার চেয়ে দেখবেন—প্লেব্যাক–সম্রাট এই বাড়িতে আসতেন, থাকতেন এবং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।

লেখক: সাংবাদিক জীবন কৃষ্ণ দেবনাথ, দৈনিক আজকালের দর্পণ, সিইপিজেড, চট্টগ্রাম।
শর্টলিংকঃ