‘ওরা আমার রান্না করা রুটি-মাংসও খেতে দেয়নি আবরারকে’

দৈনিক আজকালের দর্পন : আশা জাগানো পরিবারের একমাত্র নক্ষত্রকে হারিয়ে স্বপ্নের সঙ্গে নিজেদের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন নিহত বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদের পরিবার। তবে মামলার অগ্রগতি, প্রধানমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন তারা। তবে নিজেদের নিরাপত্তা বিশেষ করে ঢাকা কলেজে পড়া আবরারের ছোট ভাই ফাইয়াজ আবরারের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত তারা। তাই নিজেদের নিরাপত্তা আর দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চান তারা।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রাম। নিজের বাড়ির অদূরে গ্রাম্য কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ঢাকা বুয়েটে নিহত মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ। সেখানে গিয়ে দেখা যায় মৃত্যুর পাঁচদিন পরেও বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আবরার ফাহাদের কবর দেখতে ও তার পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে আসছেন। তারাও এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।

চুয়াডাঙ্গা থেকে আবরারের কবর দেখতে আসা নুরুল ইসলাম বলেন, আবরারের মৃত্যুতে কুষ্টিয়া তথা সারাদেশ একজন মেধাবী ছাত্রকে হারালো। এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন তিনি। যাতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। আর কোনও মা-বাবা তার হৃদয়ের টুকরাকে না হারায়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের ইলেকট্রিক এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কতিপয় নেতারা পিটিয়ে হত্যা করে।

গেল রোববার দিনগত রাত তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলের নিচতলা থেকে আবরারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ হত্যা নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা চলছে। আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ’র দায়ের করা চকবাজার থানার মামলায় ১৯ আসামির মধ্যে পুলিশ এরই মধ্যে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে আবরার ফাহাদের বাড়িতে ছেলে হারানোর শোকে এখনও বিলাপ করছেন তার মা রোকেয়া খাতুন। পরিবারের নক্ষত্রকে হারিয়ে নিজেদের স্বপ্নের সঙ্গে ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন পরিবারের অন্যরাও।

মা রোকেয়া খাতুন বললেন, আমি নিজ হাতে জামা ইস্ত্রি করে ছেলেকে গাড়িতে তুলে দিলাম। রুটি বানিয়ে মাংস রান্না করে দিয়েছিলাম। ওরা আমার ছেলের সেই খাবারটুকুও খেতে দেয়নি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমি এর বিচার চাই।

আমি আমার ছেলেকে বলেছিলাম বাবা তুমি বিসিএস দিয়ে ডিসি হবা। মানুষ আমাকে বলবে ডিসি সাহেবের মা। এ কথা শুনে আমার আবরার বলেছিল মা তুমি আমার কাছে সবসময় এত কম চাও কেন। এরপরে আমি আর ছেলের কাছে জীবনে কিছুই চাইনি। শুধু বলেছিলাম, মানুষ হও নামাজ কাজা করবা না। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবা না। আমার ছেলে কারও দিকে তাকিয়ে কথা বলতো না। মাথা নিচু করে রাস্তায় চলতো। সেই সোনার টুকরা ছেলেকে ওরা মেরে ফেললো। যারা আমার ছেলেকে বুয়েট ছাড়া করেছে আমি তাদেরকে বুয়েট ছাড়া দেখতে চাই। ফাঁসির মঞ্চে দেখতে চাই।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, যে ভিসি আবরারের মতো ছেলেকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। সেই ভিসি কিভাবে হাজার হাজার ছেলের নিরাপত্তা দেবে। আমার আরও একটা ছেলে আছে। সে ঢাকা কলেজে পড়ে। আমি তার নিরাপত্তা চাই। তাকে দিয়ে আমি আমার আবরারের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।

এদিকে এখন পর্যন্ত মামলার অগ্রগতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে আবরারের পরিবার।

গত বুধবার আবরারের বাড়িতে আসা বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়ে আবরারের মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই ফিরে আসেন।

আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, যে অমিত সাহাকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তার করায় আমি খুশি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ সে আবরারকে তার নিজের ছেলে বলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিও আমি সন্তুষ্ট। তারা কাজ করছেন। আমি এখন দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।

আবরারের চাচী রোজিনা খাতুন বলেন, আবরার আমাদের কাছে একটি প্রদীপ ছিল। সে আমাদের পরিবারের নক্ষত্র। সেই নক্ষত্রকে সামনে নিয়েই আমাদের সকল স্বপ্ন ছিল।

আবরারের লেখাপড়ার সুবিধার জন্য আমরা সব করেছি। জমানো অর্থ, সম্পদ খরচ করে তিল তিল করে আবরারকে এই পর্যন্ত এনেছিলাম। এখন সেই নক্ষত্রও নেই। আমাদের স্বপ্নও নেই। বলার ভাষাও নেই।

আবরার ফাহাদের হত্যা নিয়ে কোনও রাজনীতি নয়। দেশের সর্বোচ্ছ বিদ্যাপীঠে যেন এমন ঘটনা আর না হয়। সেজন্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান সবাই।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।