করোনায় বন্ধ হামের টিকা, চট্টগ্রামের ২১ লাখ শিশু ঝুঁকিতে

দৈনিক আজকালের দর্পন ডেস্ক :  ১১ মাসের শিশু আইনুল আরাফ। জন্মের পর মাত্র তিনটি টিকা পেয়েছে। এপ্রিলের শেষ দিকে আরেকটা টিকা দেওয়ার তারিখ ছিল। কিন্তু সেই তারিখে টিকা দেওয়া হয়নি। ছয় বছরের মেয়ে আফরোজা আর ছেলে আরাফকে একসাথে হামের টিকা দিবেন ভেবেছিলেন মা শেলী আক্তার। করোনার প্রাদুর্ভাবে তাও স্থগিত হওয়ায় রীতিমতো চিন্তায় পড়েছেন মা শেলী আক্তার। আরেক অভিভাবক কামরুন নাহার তার মেজ মেয়েকে ছোট বেলায় মাত্র চারটি টিকা ছাড়া ১৭ বছরে আর কোনো টিকাই দেয়নি। যার কারণে মেয়ে প্রায় সময় অসুস্থ থাকে। তাই ছোট মেয়ে নিঝুমের বেলায় টিকা নিয়ে আর কোনো ভুল করতে চাননি কামরুন নাহার। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে তাও বন্ধ হয়ে গেল। শুধু এই দুই মা-ই নন, করোনার কারণে চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলার ৯ মাস থেকে ১০ বছরের কম বয়সী মোট ২১ লাখ ২৪ হাজার ৬৫০ শিশু এক ডোজ হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। করোনারভাইরাসের কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে হামের টিকাদান কর্মসূচী কেন্দ্রীয়ভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বী। জানা গেছে, চলতি বছর রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১০ শিশু। হাম-রুবেলার টিকা কর্মসূচি বন্ধ থাকলেও জরুরিভিত্তিতে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় ওই জেলায়। এর আগে হামে আক্রান্ত হয়ে ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ছয় দিনে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সোনাই ত্রিপুরাপাড়া চার শিশু মারা যায়। এখানকার আরও ২২ শিশু রোগাক্রান্ত হয় হামে। এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের অঘোষিত লকডাউনের কারণে অনেকটা স্বেচ্ছাবন্দি রয়েছেন বেশিরভাগ মানুষ। এরই মাঝে পেরিয়ে গেছে অনেক শিশুর টিকা দেওয়ার নির্ধারিত সময়। যার কারণে বেশিরভাগ বাবা-মা উদ্বিগ্ন। নবজাতকদের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা মায়েদের অনেক বেশি। কারণ নবজাতকের টিকা শিশুর জন্মের ১৫ মাসের মধ্যে পুরো কোর্স শেষ করতে হয়। শিশুদের টিকা দেয়া কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিভিন্ন রকমের সংক্রমণের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর জন্মের পর নির্দিষ্ট সময়েই টিকা দিতে হয়। সরকারিভাবে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শূন্য থেকে দুই বছরের শিশুদের বিনা মূল্যে টিকা দেওয়া হয়। প্রায় সব সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকাদানের ব্যবস্থা রয়েছে। দেড় মাস থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত মোট পাঁচবার টিকাকেন্দ্রে যেতে হয়। প্রথম তিনটি টিকা দিতে হয় দেড় মাস, আড়াই মাস ও তিন মাস ১৫ দিনে। যক্ষ্মার টিকা ছাড়া এই টিকাগুলো মোটামুটি একই ধরনের। শেষ দুটি হলো এমআর (হাম ও রুবেলা) টিকা। এটি দিতে হয় ৯ মাস শেষ হলে এবং ১৫ মাসের মাথায়। একই ধরনের দুটি টিকার মধ্যে ন্যূনতম এক মাস সময়ের ব্যবধান থাকতে হয়। চলতি বছরের ১৮ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত তিন সপ্তাহব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি পালনের কথা থাকলেও করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করায় অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে এ টিকাদান কর্মসূচি। যার কারণে চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলার ৯ মাস থেকে ১০ বছরের কম বয়সী মোট ২১ লাখ ২৪ হাজার ৬৫০ শিশু এক ডোজ হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এদিকে হাম-রুবেলার টিকা ছাড়াও অন্যান্য টিকা থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে বলে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছেন, উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতিতে শিশুকে টিকা দিতে হবে কিনা এ নিয়ে অনেক অভিভাবক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। অনেকে এই পরিস্থিতিতে শিশুকে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যেতেও ভয় পান। কিন্তু শিশুর জন্য টিকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। বরং সময়মতো টিকাদানের অভাবে শিশুরা হাম, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়ার মতো জীবন সংহারক অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর এক-চতুর্থাংশ মারা যায় এসব রোগে। আর টিকাদানের মাধ্যমে শিশুর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। প্রাথমিক টিকাদানে যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও, হাম, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগের হাত থেকে শিশুকে রক্ষা করা যায়। এ জন্য সময়মতো ও নিয়মিত টিকাদান করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। করোনার কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৪টি দেশে হাম-রুবেলার টিকাদান কার্যক্রম দেরিতে পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা ছিল- যেসব দেশে হামের উপদ্রব নেই, সেসব দেশ করোনা মহামারির সময় এ ধরনের প্রতিষেধক দেওয়ার কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় এ বছর হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব আবার বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে স্থগিত হওয়া হাম ও রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমের লক্ষ্য হচ্ছে ৯ মাস থেকে ৯ বছরের মোট ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া।  চট্টগ্রামে ২০১৬ সালে ৬৫ জন, ২০১৭ সালে ২০০ জন, ২০১৮ সালে ৬৮ জন ও ২০১৯ সালে ৪০ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া ২০১৬ সালে ২ জন, ২০১৭ সালে ৬ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন ও ২০১৯ সালে ৩ জন শিশু রুবেলায় আক্রান্ত হয়।এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, করোনাভাইরাস লকডাউনের কারণে বিশ্বব্যাপী এ বছর প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। ফলে বিশ্বে হামে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইউনিসেফ এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরামর্শগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন নিয়মিত টিকাদান অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্দেশনা জারি করেছে। জানা গেছে, স্থায়ী এবং বিস্তৃত পরিসরে অস্থায়ী– উভয় ধরনের কেন্দ্রের মাধ্যমে অপরিহার্য সেবা হিসেবে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যা রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে লড়াই করে। তবে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ এর বিস্তারের কারণে টিকাদান কার্যক্রমের সংখ্যা বেশ কমে এসেছে। সারা বিশ্বে ৮৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়ার হার গত কয়েক বছর ধরে অপরিবর্তিতই রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে ২০ থেকে ৩০ লক্ষ শিশুর প্রাণরক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। তবে করোনাভাইরাসের উদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের হাম-রুবেলার টিকা কর্মসূচি স্থগিত করা হয়, যার কারণে চট্টগ্রামের ২১ লাখের বেশি শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নাসরিন জাহান নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘নানা কারণে সময়মতো টিকা দিতে পারিনি বলে আজ আমার ছেলেটা প্রতিবন্ধী। কিন্তু মেয়েরও এমন হোক আমি কখনও চাইনা। এখন করোনাভাইরাস। এর কোনো ওষুধ নাই তাই ভয় আরও বেড়েছে। বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না বাড়লে তো এ ভাইরাসের সাথে লড়াই করতে পারবে না। বলতে গেলে উভয় সংকটে ভুগছি।’ এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী  বলেন, ‘ইউনিসেফের একটা নির্দেশনা অনুযায়ী করোনার কারণে টিকাদানে নিষেধাজ্ঞা নেই। হাম কিন্তু সাংঘাতিক সংক্রামক রোগ। যে বাচ্চারা অপুষ্টিতে ভোগে এবং ভিটামিনের অভাব আছে, তারা যদি হাম আক্রান্ত হয়, তখন তাদের মৃত্যু ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে আরও অনেক রোগ হতে পারে। হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এসব রোগও হয়। এক্ষেত্রে ইউনিসেফের পরামর্শ বিবেচনায় রেখে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা উচিত।’ এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক জ্যাঁ গফ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘শিশুদের টিকা না দেওয়ার প্রভাব সম্পর্কে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। এই শিশুদের মধ্যে অনেকে ইতোমধ্যে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যদিও কোভিড-১৯ ভাইরাসের কারণে অনেক শিশু গুরুতর অসুস্থ হচ্ছে না, তবে নিয়মিত টিকাদান সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় লাখ লাখ শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এটি খুবই মারাত্মক হুমকি। এক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।’ একই প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বী  বলেন, ‘টিকা কার্যক্রম বন্ধ নেই। প্রধান প্রধান সেন্টারে টিকা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে লকডাউন হচ্ছে সেখানে ছাড়া গ্রাম পর্যায়ের সব জায়গায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিকা দেওয়ার কাজ চলছে। যেসব জায়গায় স্বাস্থ্যকর্মীদের যেতে হয় সেসব কিছু কিছু জায়গায় একটু সমস্যা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন এরিয়াগুলোতে ঝামেলা হতে পারে। আমার উপজেলাগুলোতে টিকা কর্মসূচি সন্তোষজনক।’ তিনি বলেন, ‘হামের টিকাদান কর্মসূচি কেন্দ্রীয়ভাবে স্থগিত করা হয়েছে। সুতরাং আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।’

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।