খেটে খাওয়া মানুষের চোখেমুখে বিষন্নতা: দান দক্ষিণাও লকডাউন

দৈনিক আজকালের দর্পন: বিশেষ প্রতিনিধি:  নগরী এখন সুনশান নীরব। নগরী ঘুরে দেখা গেছে কেউ কোথাও কোন আর্থিক অনুদান কিংবা খাবার ত্রান সামগ্রী সহায়তায় এগিয়ে আসছেন না। বিপদের দিনে বন্ধু পরিচয়। অথচ আজ বাংলাদেশ একটি কঠিন ভয়াল দিন অতিক্রম করছে, কে নেয় কার খবর, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ থাকা স্বত্বেও আজো অবদি কোন স্থানে ত্রান বিতরণের কোন খবর পাওয়া যায়নি। সবই লকডাউনে আছে, এমনকি দান দক্ষিণাও লকডাউন হয়ে আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার প্রতি অনুরোধ আপনি হলেন এ দেশের অভিভাবক এসব খেটে খাওয়া মানুষকে না খেয়ে মারা যাবে তা হতে পারে না। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করছি। আজ বাংলা নিস্তব্দ। কোথায় গেল সেই জনদরদী নেতা, কোথায় গেল গণমানুষের নেতা। করোনা থেকে বাঁচা যাবে কিন্তু না খেয়ে ত আর বাচাঁ যাবে না। বিংশ শতাব্দিতে এ রকম ‍দুর্ষিসহ চিত্র আর চোখে পড়েনি। যেমন মনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বয়ে গেছে দেশের উপর। মনে হয় সদ্য যুদ্ধাহত দেশ। কে নেয় কার খোঁজ খবর। জনমানবহীন এক পরিবেশ। বিত্তবানদের প্রতি অনুরোধ আপনারা এগিয়ে আসুন এসব দরিদ্রের আহার যোগাতে, করোনা ভাইরাস গরিবের নয় বরং ধনী বিত্তবানদের বেশী আক্রান্ত হন। আপনারা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন, আপনারা কানাডার প্রেসিডেন্ট জান্টিন ট্রুডোর স্ত্রীর চেয় বেশী গুরুত্বপূর্ণ লোক নন, বিশ্বের উন্নত দেশে উন্নত উন্নত ধনী লোকদের চেয়ে বাংলাদেশের বিত্তবানরা বেশী উন্নত বলে আমার মনে হয়। আল্লাহ্কে ভয় করুন এখন সময় দান দক্ষিণা দিয়ে পাপ মোচনের। না খেয়ে থাকা অভুক্ত খেটে খাওয়া শ্রমিকদের পাশে এগিয়ে আসুন। মানুষের আনাগোনা ও যানবাহন চলাচলের শব্দে মাতোয়ারা থাকা পুরো শহর নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে কয়েকজন পথচারীকে দেখা গেলেও তাদের চোখেমুখেও এখন রাজ্যের বিষন্নতা। সড়কে কমে গেছে রিকশার টুংটাং শব্দ। মোড়গুলোতে নেই ট্রাফিক পুলিশ। মহামারি করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্বকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে আমাদের দেশে করোনার আঘাতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে খেটে খাওয়া মানুষগুলো। করোনা সতর্কতায় যখন সবাই স্টে হোম বা ঘরে থাকার কথা বলছে, সেখানে জীবিকার তাগিদে খেটে খাওয়া মানুষগুলো বের হয়েছে সংসারের খরচ যোগাতে। করোনার চেয়েও সংসার কিভাবে চলবে সেটি নিয়েই তাদের ঢের ভয়। এদেরই একজন রিকশা চালক আইয়ুব আলী। কথা বলে জানা গেছে, পরিবারের ৭ সদস্যের ভরণ পোষণে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি। সারাদিন রিকশা চালিয়ে নিজের খরচ, রিকশা মালিকের জমা টাকা ও গ্যারেজ ভাড়া বাদ দিয়ে প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা থাকতো। রাতে যাওয়ার সময় বাজার করে নিয়ে গেলে পরদিন রান্না হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে রিকশা মালিকের জমা টাকাও উঠে না। গত ক’দিন ধরে আইয়ুব আলীর সকালটা শুরু হচ্ছে আতঙ্কে। রিকশা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে মিলছে না যাত্রী। নিজে কি খাবেন, স্ত্রী সন্তানদের কি খাওয়াবেন এই নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। খাতুনগঞ্জ এলাকার ঠেলাগাড়ি চালক হোসেন আহম্মদ। এক সময় পণ্য পরিবহন করে তার ব্যস্ত সময় কাটতো। কিন্তু ছুটির প্রথম দিন থেকে তার সময় কাটছে ঠেলায় শুয়ে-বসে। খাতুনগঞ্জের প্রায় দোকান বন্ধ, তাই কাজও কম। সারাদিন মিলে আয় হয়েছে ১৫০ টাকা। তিনি বলেন, সারাদিন কাজ করে রাস্তায় টংয়ের দোকানগুলোতে কিছু খেতে পারতাম, সব কিছু বন্ধ থাকায় এক গ্লাস পানিও খেতে পারছি না। এভাবে কতদিন চলবে বুঝতে পারছি না। সিএনজি চালক আবুল হোসেন বলেন, সারাদিন বসে বসে ঢাকায় রিকশা চালানোর খেকে গ্রামে না ...সময় কাটাতে হচ্ছে। মানুষই নাই, ভাড়া কিভাবে পাবো। এরকম হলে বউ বাচ্চা নিয়ে গ্রামে চলে যেতে হবে। অন্যদিকে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমন্টে (পিপিই) ও মাক্স উৎপাদনে নিয়োজিত কারখানা ছাড়া বাকি কারখানাগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে চট্টগ্রামের কয়েক লাখ শ্রমিক এই মুহূর্তে বেকার হয়ে গেছেন। যার অধিকাংশই নারী শ্রমিক। এদের একজন আসমা আকতার। নগরীর একটি কারখানায় সুইং অপারেটর পদে কাজ করতেন তিনি। কারখানা বন্ধ হওয়ায় কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। তিনি বলেন, কারখানা মালিকরা এমনিতে নানা ধরণের অজুহাত দেখিয়ে বেতন দিতে দেরি করে কিংবা দিতেই চায় না। এখন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিভাবে পরিবারের খরচ যোগাবো সেটি নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। জানতে চাইলে প্রবীণ অর্থনীতিবিদ মু. সিকান্দর খান দৈনিক আজাদীকে বলেন, খেটে খাওয়া মানুষদের বলা হচ্ছে, বের না হতে। কিন্তু তাদের তো অভাব আছে। এখন সরকার যদি তাদের বের হতে নিরুৎসাহিত করে, এক্ষেত্রে তাদের নিয়মিত খাবারের যোগান দিতে হবে। তারা দিনে এনে দিনে খায়। নগদ টাকা দিতে পারলে ভালো, আবার নগদ টাকা তাদের হাতে ঠিক মতো পৌঁছাবে কিনা এটিও একটি প্রশ্ন। তবে আপাতদৃষ্টিতে পণ্য সরবরাহ করা হলে তারা অন্তত না খেয়ে থাকবে না। সরকারকে নিয়মিত তাদের খোঁজখবর রাখতে হবে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।