চট্টগ্রামে করোনার নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্র যেন মাছের বাজার! পজিটিভ-নেগেটিভের হুড়োহুড়িতে উল্টো বাড়ছে বিপদ।

দৈনিক আজকালের দর্পন ডেস্ক :  করোনাভাইরাসের নমুনা দিতে গিয়ে উল্টো করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। চট্টগ্রাম নগরীতে উন্মুক্ত স্থানে সাধারণ কাঁচাবাজারেও যতোটুকু সামাজিক দূরত্ব মানার প্রবণতা দেখা যায়, নগরীর অন্যতম প্রধান এই হাসপাতালে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহের স্থানে উল্টো সামাজিক দূরত্ব না মানারই যেন প্রতিযোগিতা চলছে প্রতিদিন। এর মধ্যেই করোনার নমুনা দিতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন করোনার উপসর্গ থাকা অসুস্থ রোগীরা ছাড়াও সাধারণ মানুষ। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সম্ভাব্য করোনা পজিটিভ যেমন নমুনা দিতে যাচ্ছেন, তেমনি সম্ভাব্য করোনা নেগেটিভ ব্যক্তিরাও নমুনা দিতে যাচ্ছেন। ফলে হাসপাতালে কেবল নমুনা দিতে এসেই পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে সুস্থ ব্যক্তিরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। সব দেখেও জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা আনা কিংবা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে করোনার নমুনা সংগ্রহের স্থানের ঠিক পাশেই রয়েছে ফ্লু কর্নার। সেখানে জ্বর-সর্দি-কাশির মতো করোনার সাধারণ উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। এর ঠিক বাইরেই প্রতিদিনই করোনার নমুনা দেওয়ার জন্য প্রচুর লোকের ভিড় জমে। সেখানে সামাজিক দূরত্ব তো মানাই হয় না, বরং ভিড় ঠেলে কে কার আগে সামনে যাবে— তারই প্রতিযোগিতা চলছে প্রতিদিন। সম্প্রতি করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হওয়া মাহিন শাহরিয়ার আকিব নামে এক শিক্ষার্থী  বলেন, ‘জেনারেল হাসপাতালের ফ্লু কর্নারের বাইরে যারা সেবা নিতে আসেন, তাদের কাছে আগাম টিকেট বিক্রি করা হয় না। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষরাই নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে সিরিয়ালের ব্যবস্থা করে থাকেন। কিন্তু এরপরও কে আগে ঢুকবেন— তা নিয়ে হুড়োহুড়ি অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই ফ্লু কর্নারের পাশেই মাত্র ২-৩ ফুট দূরত্বে উন্মুক্ত স্থানে করোনাভাইরাসের নমুনা দিতে আসা মানুষদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখানকার অবস্থা আরও ভয়াবহ অবস্থা। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে ধৈর্য হারিয়ে ফেলা মানুষজন অনেকটা ভীড় করে নমুনা দেয় সেখানে। এমনকি যেখানে নমুনা সংগ্রহ করা হয় সেখানে নমুনা সংগ্রহকারীদের পাশেই অনেকে দাঁড়িয়ে থাকে। নমুনা সংগ্রহের সময় অনেকে কাশি দিয়ে উঠেন, অনেক হাঁচি দিয়ে উঠেন, অনেকেরই আবার জ্বর থাকে— অথচ সেখানে নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব মানার সামান্য আগ্রহ মানুষদের যেমন থাকে না, তেমনি জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয় দেখলাম।’ অন্যদিকে করোনার লক্ষণ থাকা অসুস্থ রোগীরা নমুনা দিতে এসে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সকাল নয়টার দিকে নমুনা নেওয়ার কাজ শুরু হলেও ‘সিরিয়ালে’ থাকার জন্য অনেককে সেই গভীর রাতে হাসপাতালে এসে অপেক্ষা করতে হয়। নমুনা দেওয়ার জন্য দিনের পর দিন ধরনা দিতে হচ্ছে অসুস্থ অনেক রোগীকে। সিরিয়াল দেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না থাকায় পরপর তিন দিন গিয়ে ফিরে এসে চতুর্থ দফায় নমুনা দিতে পেরেছিলেন আকিব। সেখানে তিন দিনই একইরকম চিত্র দেখেছেন বলে জানান আকিব।এদিকে করোনাসন্দেহের এক রোগীর চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মানবাধিকার কর্মী আমিনুল হক ফেসবুকে লিখেছেন— ‘গত ৮ দিন ধরে করোনার লক্ষণ নিয়ে অসুস্থ এমন এক রোগী গতকাল রাতে অসুস্থতা বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা নিয়ে কোন এক মাধ্যমে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এক ডাক্তার পরামর্শ দেন— আগে করোনা টেস্ট করুন। ফেরত যাতে না আসতে হয়, সেই ভরসায় আজ কাকডাকা ভোরে ৫.৩০টায় ঘর থেকে বের হয়ে ৬টায় তিনি পৌঁছে যান জেনারেল হাসপাতালে করোনা টেস্ট করতে। সেখানে উনি গিয়ে দেখেন আনুমানিক ২০-৩০ জন লোক অপেক্ষারত। কথায় কথায় জানতে পারেন কারও আগমন রাত তিনটায়। যাই হোক ৯ টার দিকে শুরু হয় পরীক্ষা। সিরিয়াল ধরে অপেক্ষা। কিন্তু দুপুর ১২.৩০ টায় শেষ পর্যন্ত বসে থেকেও তার সিরিয়াল হয়নি। তাকে ফেরত আসতে হয়। এই অসুস্থ ব্যক্তি দিশেহারা হয়ে বাঁচার তাগিদে এবং নির্ভরতার জায়গা মনে করে দৌড়ে যান ফিল্ড হাসপাতালে। সেখান থেকে বলা হয়— আগে করোনা পরীক্ষা করুন, যদি পজিটিভ হয় ভর্তি নেওয়া হবে। আজকের ভোর ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত পুরো দিনের এই হলো ভদ্রলোকের অভিজ্ঞতা। হয়তো কাল আবার তার সকাল শুরু হবে জেনারেল হাসপাতালে সিরিয়াল ধরে, নচেৎ শেষ ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তির চেষ্টা। এভাবে পজিটিভ আর নেগেটিভের বেড়াজালে দৌড়াতে দৌড়াতে ভাগ্যবান হলে হয়তোবা তিনি বেঁচে যাবেন।’

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।