চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সড়কে আধঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে চার ঘণ্টা

দৈনিক আজকালের দর্পন :আবারও স্থবির চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সড়ক। বারিক বিল্ডিং থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত ‘ম্যারাথন’ যানজটে মানুষের স্বাভাবিক পথচলা কঠিন হয়ে পড়েছে। আধঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে তিন থেকে চার ঘণ্টা। স্থানীয় কয়েক লাখ মানুষের জীবন দুর্বিষহ। দিনভর থাকা এই যানজটে অনেক অফিসগামী, বিদেশগামী, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীর যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। নষ্ট হচ্ছে শ্রমঘণ্টা।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিমানবন্দর থেকে শহরে প্রবেশ করতে হিমশিম খাওয়া বিদেশি ক্রেতারা চট্টগ্রামে না এলে গার্মেন্টস সেক্টর বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গেটগুলোতে যানজটের কারণে পুরো এলাকা স্থবির হয়ে গেছে। অবশ্য বন্দর কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছে। বন্দর পুলিশ এবং ট্রাক মালিক সমিতির সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহনে প্রতিদিন পাঁচ হাজারেরও বেশি ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, কন্টেনার মুভার চলাচল করে। এর বাইরে বন্দর ব্যবহারকারীদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও অনেক। বিপুল সংখ্যক গাড়ি বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করার সময় গেট পাসের বিধান রয়েছে। গেট পাস ইস্যুতে কিছুদিন থেকে নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। এতে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইস্যুকৃত গেট পাসের ফি-ও বাড়ানো হয়েছে।আজকালের দর্পণ
ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, আগে যেখানে এক মিনিটেরও কম সময়ে ভেতরে গাড়ি যেত, সেখানে এখন আট-দশ মিনিট লাগছে। কখনো কখনো একটি গাড়ির জন্য ১৫ মিনিটও লাগে। শুধু পাস ইস্যুই নয়, গাড়ি চেক করার জন্যও যথেষ্ট সময় লাগছে। আর এই সময়ে সল্টগোলা ক্রসিংয়ে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। রাস্তার উপর বন্দরমুখী শত শত কন্টেনার মুভার আটকা পড়ে। স্থানীয় বিভিন্ন আইসিডি থেকে বের হওয়া অসংখ্য গাড়ি পুরো এলাকাটিকে স্থবির করে দেয়। গত কয়েকদিন ধরে ভয়াবহ এই অচলাবস্থা চলছে। বন্দরের সল্টগোলা ক্রসিংয়ের গেটকে কেন্দ্র করে আগ্রাবাদ থেকে বারিক বিল্ডিং, ফকিরহাট, নিমতলা, পিসি রোড, টোল রোড, বড়পুল, কাস্টম মোড়, সল্টগোলা, ইপিজেডসহ বিমানবন্দর সড়কে কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বন্দর কেন্দ্রিক পণ্যবাহী গাড়ির প্রয়োজনীয় টার্মিনাল না থাকায় ট্রাফিক বিভাগ সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার পণ্যবাহী গাড়ি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দর সড়কে নজিরবিহীন যানজট
বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মানের বন্দর হিসেবে নিরাপত্তার স্বার্থে আমদানি-রফতানির পণ্য, কন্টেনার পরিবহনে নিয়োজিত গাড়ির চালক ও সহকারীর ‘পাস’ ইস্যুতে কিছু ডকুমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়। এর মধ্যে আছে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সহকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ। দুই মাস ধরে এ নিয়মে সব পণ্যবাহী গাড়ি পাস সংগ্রহ করলেও সমপ্রতি একটি চক্র জলাবদ্ধতা, সড়ক সংস্কার ইস্যুতে বিমানবন্দর সড়কে সৃষ্ট যানজটকে পুঁজি করে বন্দরের পণ্যবাহী গাড়ির সহকারীর পাস ইস্যুর বিষয়টি জুড়ে দেন। গত সোমবার বিকেল থেকে এ নিয়ে চালক ও সহকারীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরই জের ধরে পরিবহন শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে সোমবার রাতভর বন্দর থেকে পণ্য খালাস বন্ধ থাকে। গতকাল সকালে পণ্য খালাস শুরু হলেও যানজটে পুরো এলাকা স্থবির হয়ে পড়ে। রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ থয়ে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস এবং হ্যান্ডলিং কার্যক্রমেও স্থবিরতা বিরাজ করছে।
বন্দরের কর্মকর্তারা বলেছেন, ইন্টারন্যাশনাল শিপ অ্যান্ড পোর্ট ফ্যাসিলিটি সিকিউরিটি কোড (আইএসপিএস) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বন্দরে অটোমেশন, ডাটাবেজ তৈরিসহ অনেক কাজ চলছে। এরই অংশ হিসেবে পণ্যবাহী গাড়ির ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। এক্ষেত্রে চালকদের লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও সহকারীদের অনেকে জাতীয় পরিচয়পত্রও দেখাতে পারছে না। অনেকের বয়স মাত্র ১৩-১৫ বছর। এসব সহকারীকে বন্দরে প্রবেশের পাস দিলে অনেক চালক তাদের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে দেন। এর ফলে বন্দরের অভ্যন্তরে দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় প্রাণহানিও হচ্ছে। তাই এসব সহকারীর পাস দেওয়া হচ্ছে না। আর পাস না দেওয়ার জের ধরে বন্দরে বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বন্দরের বাইরের সড়কে যানজট হচ্ছে ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতার কারণে বড় বড় খানাখন্দ এবং রং সাইডে গাড়ি চালানোর প্রবণতা বাড়ার কারণে।
অবশ্য পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বন্দর কেন্দ্রিক গাড়ির কারণে পুরো এলাকা স্থবির করে রাখা হয়। আমরা বাধ্য হয়ে হজযাত্রী এবং বিমানযাত্রীদের রং সাইডে যেতে দিচ্ছি। যদি রং সাইডে এদেরকে যেতে না দিই তাহলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।
পরিবহন শ্রমিকদের একজন নেতা দৈনিক আজকালের দর্পনকে জানান, বন্দরে প্রতিদিন প্রাইম মুভার, কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজারের বেশি গাড়ি যাওয়া-আসা করে। বন্দরে পণ্য পরিবহনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গাড়ি আসে। এখন গাড়ির সহকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, অনলাইন জন্মনিবন্ধন ছাড়া পাস ইস্যু না করায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বড় গাড়িগুলো সহকারী ছাড়া শুধু চালকের পক্ষে হুক পয়েন্টে বা টার্মিনালে গিয়ে পণ্য লোড-আনলোড, কাগজপত্র বুঝে নেওয়া সম্ভব নয়।
যানজটে পড়া লায়ন মোহাম্মদ মোরশেদ  ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভয়াবহ এক অবস্থার মধ্যে আছি। আমার মেয়ে আগের দিন কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে আগ্রাবাদ থেকে হেঁটে মাইলের মাথায় এসেছে। শহরের একটি বিস্তৃত এলাকা মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগ্রাবাদে তীব্র যানজট দেখে বড় পোল দিয়ে আসি। সেখানেও যানজট। তারপর সংস্কারের জন্য বন্ধ রাখা এক পাশ দিয়ে উল্টোপথে বন্দর স্টেডিয়ামের পাশের পথ দিয়ে চলে আসি। আমার অনেক সহকর্মী আগ্রাবাদ থেকে হেঁটে কাস্টম মোড় এসেছেন। তারা গন্তব্যে যেতে পারছেন না। বন্দর এবং আগ্রাবাদ এলাকায় যানজটের চাপ পুরো নগরীতে পড়েছে।
যানজটে বেকায়দায় পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী বলেছেন, বিমানবন্দর থেকে শহরে আসা-যাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তিন ঘণ্টায়ও শহরে বা বিমানবন্দরে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এতে বিদেশি ক্রেতাদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যানজটের কারণে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মতো গার্মেন্টস খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরমুখী সড়কের যানজট নিরসনে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সিএমপি কমিশনারকে চিঠি দিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম।
চিঠিতে তিনি বলেন, সমপ্রতি অতি বর্ষণে জলবদ্ধতাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন ও বিমানবন্দর অভিমুখী সড়কে তীব্র যানজটের কারণে রফতানি পণ্যবাহী চালান প্রাইভেট আইসিডিগুলোতে যথাসময়ে প্রেরণ করা যাচ্ছে না এবং বন্দর জেটি থেকে আমদানিকৃত পণ্য ডেলিভারি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদেশি ক্রেতার নির্ধারিত লিড টাইমের মধ্যে রফতানি পণ্য জাহাজিকরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে রফতানি আদেশ বাতিলসহ স্টক লটে পরিণত হয়ে বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এতে জাতীয় রফতানির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদেশি ক্রেতারা উল্লেখিত সমস্যার কারণে চট্টগ্রামের পোশাক শিল্প মালিকদের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সভা বাতিল করে শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ফিরে যাচ্ছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের পোশাক শিল্প মালিকদের পক্ষে ঢাকায় নির্ধারিত ক্রেতাদের সঙ্গে সভায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যানজটের কারণে ইপিজেডের অধিকাংশ পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীরা উপস্থিত হতে না পারায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে কারখানাগুলো ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে চট্টগ্রামের বিদেশি বিনিয়োগসহ ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত বলে আশঙ্কা করা হয়।বর্ণিত বিষয় বিবেচনা করে রফতানির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন এলাকাসহ বিমানবন্দরমুখী রাস্তাগুলো যানজট মুক্ত রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সিএমপির সহযোগিতা চাওয়া হয়।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।