ধর্ষণের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে সরকার : সাংবাদিক জীবন কৃষ্ণদেবনাথ

দৈনিক আজকালের দর্পণ:  নারী ও শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে রয়েছে সরকার। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থায় পদক্ষেপ নিতে কঠোর অবস্থানে বর্তমান সরকার। এ জন্য যা যা করণীয়, তাও গ্রহণ করছে তারা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে সরকারের এই অবস্থানের কথা জানা গেছে।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার বিষয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে একজন গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন এবং এই সময়ে আরও কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে কয়েক দিন ধরে ঢাকাসহ দেশটির বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ থেকে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমেও এই দাবি নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছে। রাজপথের বিক্ষোভ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদে এখন ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি তোলা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্ষণের বিচার না পাওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের চরম হতাশা তৈরি হয়। এই আন্দোলনের মুখে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করার এই দাবি সরকার বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, জনগণের কাছ থেকেই তো দাবিটা উঠেছে। এখন এটাকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। এই দাবিটা বিবেচনা করব। তার কারণ হচ্ছে, আমরা ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য যা যা করণীয়, সেটা করার চেষ্টা আমরা করব। এই দাবির প্রেক্ষিতে আমরা যেটা বিবেচনা করব, সেটা হচ্ছে, আবারও এই আইনটা সংশোধন করে এটা আনা যায় কিনা? মন্ত্রী বলেন, এই দাবির ভাল মন্দ দুই দিকই বিবেচনা করা হবে। সেজন্যই আমি বলেছি যে বিবেচনা করা হবে। ধর্ষণ এবং নারী নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে আন্দোলনকারিদের বক্তব্য হচ্ছে, এখন আইনে ধর্ষণের যে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজা রয়েছে, তা অপরাধ দমনে কঠিন কোনো বার্তা দিতে পারছে না। এ ছাড়া বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই সাজাও হয় না। সেজন্য তারা মৃত্যুদণ্ডের দাবিকে সামনে আনছেন।
ধর্ষণের বিচার শেখ হাসিনার আমলেই হয়েছে জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার যে দাবি উঠেছে, তাতে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এর আগে এসব অপরাধের বিচার হয়নি। তিনি বলেন, উন্নয়নের গতি ধরে রাখার পাশাপাশি সামাজিক অপরাধ, দুর্নীতি, অনিয়ম, বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারে অবস্থান স্পষ্ট। দুর্নীতি-অনিয়ম করে যেমন কেউ ছাড় পায়নি, তেমনি নারীর প্রতি, শিশুদের প্রতি অন্যায়ের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে।
ধর্ষণ-নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তিনি বলেছেন, এদের ছোটখাট লঘু দণ্ড দিয়ে লাভ নেই। সর্বোচ্চ বিচারের যে দাবি উঠেছে, আমার মনে হয় এটা অযৌক্তিক নয়। এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনকে আপসহীন মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্ষক যেন কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় না পায় সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
তিনি বলেছেন, যে সকল অপরাধী বা ধর্ষক এ সব ঘৃণ্য কাজ করছে, তাদের জন্য শাস্তিই শেষ কথা নয়, তারা কোন রাজনৈতিক দলের ছায়ায় থাকলে তাদের চিরতরে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। ধর্ষণকারী যেন কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ের ঠিকানা না হয় এবং ধর্ষকদের যেন কোনো রাজনৈতিক দল প্রশ্রয় না দেয়।
ধর্ষণের অনুসন্ধান ও বিচারে হাইকোর্টের ১৮ দফা নির্দেশনা: ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু অনুসন্ধান ও বিচার নিশ্চিতে ১৮ দফা নির্দেশনা সংবলিত রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এতে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নমূলক সব ঘটনায় বাধ্যতামূলকভাবে অভিযোগ প্রাপ্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি রিপোর্ট সংগ্রহ বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার যে কোনো ব্যর্থতাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়ের ও তদন্তের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্নিষ্টদের এই নির্দেশনা মেনে চলতে রায়ে বলা হয়েছে। এ ছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরি করতে আইন মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ মহাপরিদর্শককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও বলা হয়েছে রায়ে। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রায়ে ১৮ দফা এই নির্দেশনা দেন।
১৮ দফা নির্দেশনা : ১. ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন বা এ-সংক্রান্ত ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ লিখিতভাবে রেকর্ড করবেন। এক্ষেত্রে ওই থানার আওতার মধ্যে ঘটনা সংঘটিত হোক বা না হোক, সেটা মুখ্য নয়। ২. অবিলম্বে এমন একটি সার্ভার তৈরি করতে হবে, যাতে এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি অনলাইনের মাধ্যমে করা যায়। ৩. সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনো পুলিশ অফিসার যদি অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব করে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট বিধান থাকতে হবে। ৪. প্রত্যেক থানায় কনস্টেবলের নিচে নয়, এমন একজন নারী পুলিশ রাখতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর ডিউটি অফিসার একজন নারী কর্মকর্তার (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাধ্যমে ও ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী, সমাজকর্মী বা আইনজীবীর উপস্থিতিতে অভিযোগ রেকর্ড করবেন। ৫. সবক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর সমস্ত তথ্য সংরক্ষণে গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। ৬. প্রত্যেক থানায় ভুক্তভোগীদের জন্য সহযোগিতাপূর্ণ নারী সমাজকর্মীদের একটি তালিকা তৈরি রাখতে হবে। ৭. ভুক্তভোগীর আইনজীবী, সংশ্লিষ্ট বন্ধু, সমাজকর্মী অথবা নিরাপত্তা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তার অভিযোগ রেকর্ড করতে হবে। ৮. অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দেওয়া অধিকার সম্পর্কে ভুক্তভোগীকে সচেতন করতে হবে এবং সে চাইলে যে কোনো তথ্য প্রদান করতে হবে। ৯. অভিযোগ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ডিউটি অফিসারকে ‘ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার’-এ অবহিত করতে হবে। ১০. ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার কোনো নারী বা মেয়ে করণীয় সম্পর্কে বুঝতে অক্ষম হলে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে। ১১. লিখিত তথ্য গ্রহণের পর কোনো প্রকার বিলম্ব না করে তদন্ত কর্মকর্তা ভুক্তভোগীকে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করবেন। ১২. ভুক্তভোগীর দ্রুত সেরে উঠতে ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারে সার্বক্ষণিক প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকতে হবে। ১৩. ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নমূলক সব ঘটনায় বাধ্যতামূলকভাবে অভিযোগ প্রাপ্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হবে। ১৪. অপরাধ ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিএনএসহ অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে তা ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবে পাঠাতে হবে। ১৫. যে কোনো রিপোর্ট সংগ্রহ বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তদন্ত সংস্থার যে কোনো ব্যর্থতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। ১৬. যত দ্রুত সম্ভব মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করবেন। ১৭. নারী ও শিশুদের ওপর সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ‘১০৯২১’ নম্বরে ফোন করে যেন প্রতিকার পেতে পারে, সে বিষয়টি প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং ওয়েব সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। এবং ১৮. ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরামর্শ দানের জন্য প্রত্যেক মহানগরে একটি করে সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
যেভাবে ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার সম্ভব : বর্তমানে দেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতে সব পেশার মানুষ সোচ্চার। প্রতিদিন মানুষ রাস্তায় প্রতিবাদ করছে দ্রুত ও কার্যকর বিচারের জন্য। বাংলাদেশের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বিচারের লক্ষ্যে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০০৩ সালে ওই আইনের সংস্কার করে বিশেষ সংশোধনী আনা হয়। ওই আইনের অধীনে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারের লক্ষ্যে জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৮ সালে নতুন করে ৪১টি এবং ২০২০ সালে ছয়টি ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো হয়। বর্তমানে ১০১টি ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন দায়েরকৃত প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড় বিচারাধীন মামলার হার প্রায় ১ হাজার ৬৮৪ হয়। ১০১টি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই বিপুলসংখ্যক মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। তার পরও সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী চাঞ্চল্যকর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা, রুপা গণধর্ষণ ও হত্যা মামলা, রিফাত শরীফ হত্যা মামলাসহ বেশকিছু মামলায় দৃষ্টান্ত হিসেবে দ্রুতগতিতে নিষ্পত্তি করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে যেভাবে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, সেক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর বাস্তব প্রয়োগের লক্ষ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা যায়। এছাড়া ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য মহানগর এলাকায় ও বিভাগীয় জেলায় শুধু ধর্ষণ মামলার বিচার করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যায়। এই ট্রাইব্যুনালগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার শেষ করবে। এছাড়া দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের সমন্বয়ে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী উপস্থাপন ও যথাযথ সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতি জেলায় বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা আবশ্যক। আমাদের একটি উন্নত ও কার্যকর আইন থাকার পরও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে বিচারের দাবিতে ছাত্র, শিক্ষক ও গণমানুষকে রাস্তায় আন্দোলন করতে দেখা যায়। কেবল আইনের যথাযথ প্রয়োগই ধর্ষণের মতো ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে।
লেখক, কবি, সাহিত্যিক, উপন্যাসিক শিক্ষক ও সাংবাদিক: চৌধুরী জীবন কৃষ্ণ দেবনাথ, প্রকাশক ও সম্পাক, দৈনিক আজকালের দর্পন, সিইপিজেড, চট্টগ্রাম।
শর্টলিংকঃ