রমজানের বরকতে আল্লাহ্ করোনা থেকে মুক্তি দিন: এম. ইকবাল হোসাইন আরজু

দৈনিক আজকালের দর্পন/বিশেষ প্রতিনিধি : মুসলিম জাহানের বহু কাক্সিক্ষত মাহে রমজান এসেছে। পরম দয়ালু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের বিশ্বব্যাপী করোনার এই মহাদুর্যোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করেন, আমাদের রোজা কবুল করেন, সারা পৃথিবী থেকে সমস্ত বালা-মুসিবত দূর করেন, পবিত্র মাহে রমজানে বিশ্বমানবতার পক্ষে দয়াময় মহাপ্রভু আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে কায়মনে এই প্রার্থনা করি। এক অসহ্য দমবন্ধ পরিবেশে জীবন চলছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা পৃথিবী স্তব্ধ। এটা খুবই সত্য, বড় বড় মহাশক্তিধর উন্নত দেশের চাইতে ঘনবসতি বাংলাদেশে আমরা এখনো ভালোই আছি। এতে কারও কোনো সন্দেহ নেই- আল্লাহর রহমতে বালা-মুসিবত কেটে গিয়ে আমরা আবার আলোর মুখ দেখব। করোনার প্রাদুর্ভাবে বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়ার দ- ছয় মাসের জন্য স্থগিত রেখে তাঁকে মুক্তি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনে মানবিক শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত বলে ভবিষ্যতে বিবেচিত হবে। এক মাস কয়েকদিন তিনি কারাগারের বাইরে। এ এক মাসে কারও সঙ্গে দেখা করেননি। বলতে গেলে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন- এটা খুবই ভালো কথা। পত্রিকায় দেখলাম রোজার পর তিনি লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ-মেলামেশা করবেন। জানি না তাঁকে কীভাবে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কোনো শর্ত থাকলে সেই শর্তের মধ্যে তাঁকে থাকতে হবে। আর এ ছয় মাস বা যত দিন মুক্ত তত দিন তিনি দেশের স্বাধীন নাগরিক এমন হলে যা খুশি তা করতে পারবেন। আর যদি সাজা স্থগিত রেখে মুক্তি দেওয়া হয় তাহলে সরকারেরও নানা শর্ত থাকতে পারে। দেখা যাক, আগামীতে কী হয়! তবে ৭৫ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর করোনার এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মুহূর্তে মুক্ত থাকা দেশ ও জাতির জন্য এক পরম স্বস্তি। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে কোনো সরকারের এমন সুখকর সিদ্ধান্ত আর হবে না। তবে এই সময় জেলখানার কয়েদি-আসামিদেরও মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল। কতটা কি হচ্ছে জানি না, তবে শুনেছিলাম সত্তরোর্ধ্ব ও অন্যদের মুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। তবে আগেকার দিনের কয়লার ট্রেনের মতো ঝিকঝিক করে চললে হবে না, সিদ্ধান্ত রকেট গতিতে নিতে হবে। পত্রিকায় দেখলাম, থানার ওসি বাড়িতে বসে থেকে রণক্ষেত্রে আছেন বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপিকে জানিয়েছিলেন। মোবাইল ফোন হওয়ায় এখন অনেকেই ও রকম বলে। আছে ময়মনসিংহ, বলে মতিঝিল। মানুষের ভিতরে আল্লাহ বাস করেন। মিথ্যা বলা পাপ- এটা যখন কেউ ভুলে যায় তখন তাকে সামাল দেওয়া কঠিন। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারীর নামাজে জানাজার ঘটনায় ওসি শাহাদৎ হোসেন টিটু ঘরে বসে মিথ্যা রিপোর্ট করায় থানা থেকে তুলে আনা হয়েছে। তাকে নাকি আবার জেলা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে। দায়িত্ব অবজ্ঞায় যার জেল-জরিমানা হওয়ার কথা, তাকে যদি তদন্তের আগেই দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা খুব একটা সহজ হবে না। করোনার জন্য দেশে কোয়ারেন্টাইন চলছে সেই মার্চের গোড়া থেকে। একটা প্রশ্ন কিছুতেই মন থেকে দূর করতে পারছি না। চীনে আক্রান্ত উহান প্রদেশ থেকে বাংলাদেশ বিমানে প্রথম যাত্রায় ১৬৩ জন আমাদের বীর সন্তানকে আনা হয়েছিল। তারা দারুণ অনাদরে অব্যবস্থার মধ্যে আশকোনা হজক্যাম্পে ছিলেন। তাদের একজনও করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না। ১৪ দিন কারা নির্যাতনের চাইতে বেশি অনাদরে থেকে বাড়ি ফিরেছেন। প্রায় দুই মাস তাদের কোনো খবর নেই। মনে হয় ভালোই আছেন। আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন এটাই কামনা করি। তাই করোনা নিয়ে আমরা যথাযথভাবে অগ্রসর হতে পারছি কিনা বুঝতে পারছি না। আমি ২৪ মার্চ গণপরিবহন বন্ধের আগে আগে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় এসেছিলাম। খুব একটা বেশি গাড়ি-ঘোড়া ছিল না। মিরপুর সেতু থেকে নামার সময় পুলিশের ব্যারিকেডে একজন সাব ইন্সপেক্টর সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘স্যার, ভালো আছেন? স্যার, ভালো আছেন?’ অনেকেই বলে। সবার কণ্ঠেই দরদ থাকে। কিন্তু তার কণ্ঠে দরদ ছিল অভাবনীয়, হৃদয়কাড়া। মিরপুর সেতু এমনিতেই আমার প্রাণের সেতু। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় মিরপুর সেতুতে পা রেখেছিলাম। যদিও সেটা এখনকার সেতু নয়। সেটা এখনকার সেতুর পাশে লোহার জীর্ণশীর্ণ সেতু। যে সেতুর নাম হওয়া উচিত ছিল ‘স্বাধীনতা সেতু’। সে সেতুর ওপর দিয়ে আমরা ঢাকা জয় করেছিলাম, নিয়াজির গুহায় গিয়ে তাকে বন্দী করেছিলাম। সেই সেতু আজ অবহেলা-অনাদরে পড়ে আছে। যেটা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত হওয়ার কথা। কবে কোন দিন পুরান জীর্ণ হওয়ার কারণে ভেঙে ফেলা হবে, যুদ্ধজয়ের স্বাধীনতার কোনো চিহ্নই থাকবে না। তবে সেতুটি আমার কাছে খুবই প্রিয়। মিরপুর দিয়ে যাওয়া-আসার পথে প্রতিবারই মনে-প্রাণে শিহরণ জাগায়।

চলতি বছর মাহে রমজান এমন একসময় এসেছে যখন সারা দুনিয়া করোনাভাইরাস নামের মহামারীতে আক্রান্ত। এ মহামারী ইতিমধ্যে প্রথম মহাযুদ্ধের চেয়েও বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। আরও কত জীবন কেড়ে নেবে সে আশঙ্কায় ভুগছে প্রতিটি মানুষ। করোনার এই দুঃসময়ের মধ্যেও কোটি কোটি মুসলমান রোজা পালন করছেন মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য। আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রমাণে মুমিনরা সিয়াম সাধনায় নিয়োজিত থাকছেন।

রোজা একটি অবশ্যপালনীয় ইবাদত। নামাজের পরই রোজার স্থান। সব নবীর আমলে রোজা পালন করা হতো। দুনিয়ার প্রায় সব ধর্মেই রোজার বিধান রয়েছে। রোজা যে মানবদেহের জন্য কল্যাণকর তা আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করে। রোজার বিধান যে হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে তা আল কোরআনেও স্পষ্ট করা হয়েছে।

সূরা আল বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ইমানদারগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল।’

কোরআনের উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন শুধু উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য নয়, আদম (আ.) থেকে শুরু করে সব নবীর আমলেই রোজার বিধান ছিল। রোজা এমন এক ইবাদত যা পালনকারী এবং আল্লাহর পক্ষেই শুধু জানা সম্ভব।

আমরা ভোরে সাহরি খাই। সারা দিন খাদ্য, পানীয় ও সব ধরনের দৈহিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকি। রোজাদাররা আল্লাহর ভয়ে খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সব ক্ষেত্রে সংযম পালন করে। নিজেদের আল্লাহমুখী করার চেষ্টা চালায়। রোজার মাধ্যমে মানুষ আত্মসংযমের শিক্ষা পায়।

এ সংযম মানুষকে শুদ্ধচারী হওয়ার পথ দেখায়। ঘরে খাদ্য থাকতেও রোজা পালনের সময় সেই খাদ্য গ্রহণ থেকে মুমিনরা দূরে থাকে। আল্লাহর প্রতি ভয় তাদের দীর্ঘ সময় খাদ্য ও পানীয় থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।

রোজার এক মাস মুমিনদের জীবন পুরোপুরি আল্লাহমুখী হয়। একেবারে প্রত্যুষে সাহরি খাওয়া, তারপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তারাবির পাশাপাশি অনেকে দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলে কোরআন তিলাওয়াত করে সময় কাটায়। রোজার মাসে আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্য অনেক বেশি স্পষ্ট হয়।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাস থেকেই সিয়াম বা রোজার প্রস্তুতি নিতেন। শাবান মাসে তিনি বেশি বেশি রোজা রাখতেন। সাহাবিদেরও উদ্বুদ্ধ করতেন। যাতে রোজার মাসে রোজা থাকতে তাদের কষ্ট না হয়। একবার শাবান মাসের শেষ দিন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামের এক মাহফিলে ভাষণ দান করেন।

তিনি মহান আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ করার পর বললেন, হে মানুষসকল! এক সুমহান মাস তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করেছে। এ এক মুবারক মাস। এ মাসের মধ্যে এমন এক রাত রয়েছে যা ১ হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ এ মাসে রোজা ফরজ করেছেন। আর এ মাসে রাতের কিয়াম নফল করা হয়েছে। যে ব্যক্তি এ মাসে আন্তরিকতা সহকারে নফল কাজ করে সে যেন অন্য মাসে ফরজ কাজ করে। যে এ মাসে একটি ফরজ কাজ সম্পাদন করে সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ কাজ করে। এ মাস সবর ও ধৈর্যের। সবরের বিনিময় হলো জান্নাত। এ মাস সহানুভূতির। এ মাসে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি পায়। যে এ মাসে রোজাদারকে ইফতার করায়, তার গুনা মাফ হয় এবং তার ঘাড় দোজখের আগুন থেকে পরিত্রাণ লাভ করে। রোজাদারের জন্যও অনুরূপ সওয়াব রয়েছে। রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই হ্রাস করা হয় না।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভাষণ শোনার পর সাহাবায়ে কিরাম আরজ করল, হে রসুলুল্লাহ! রোজাদারকে ইফতার করানোর সামর্থ্য আমাদের প্রত্যেকের নেই।

এর উত্তরে তিনি বললেন, যে এক ফোঁটা দুধ বা একটি খেজুর বা সামান্য পানির দ্বারা রোজাদারকে ইফতার করায়, আল্লাহ তাকেও এ সওয়াব দান করেন। যে রোজাদারকে পেট ভরে খাদ্য দান করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন আমার হাউসে কাওসার থেকে পানি পান করাবেন এবং জান্নাতে না যাওয়া পর্যন্ত সে ব্যক্তির কোনো পিপাসা লাগবে না।

এ মাসের প্রথম ১০ দিন রহমত, মাঝের ১০ দিন মাগফিরাত এবং শেষ ১০ দিন দোজখের আগুন থেকে পরিত্রাণ লাভের। এ মাসে যে ব্যক্তি তার অধীনদের কাজ হালকা করে দেয়, আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন এবং দোজখ থেকে নাজাত দান করেন।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরোক্ত ভাষণের আলোকে আমরা করোনার এই দুঃসময়ে গবির-দুঃখীরা যাতে সাহরি ও ইফতারের তৌফিক লাভ করে তা নিশ্চিত করতে তাদের পাশে দাঁড়াব। আল্লাহর কাছে দুনিয়াবাসীকে করোনাভাইরাসের থাবা থেকে মাফ করার প্রার্থনা জানাব। দয়ালু আল্লাহ রমজানে আমাদের প্রতি তাঁর রহমতের হাত বাড়াবেন- আমরা এমন আশা করতে চাই।

শর্টলিংকঃ