ইরানে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে বোমা হামলা, নিহত বেড়ে ৭৮৭ ম কাতারে ১১০ কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস । কুয়েত, সৌদি ও বৈরুতে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ । আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিঘাত চলবে : তেহরান,
আকাশপথে যুদ্ধের আবহে ইরান ও ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বৃহত্তর অঞ্চলে। সাইরেন, বিস্ফোরণ আর আতঙ্কে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শহরে কাটছে অস্থির সময়। ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতে সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাল্টাপাল্টি আঘাতে বাড়ছে নিহতের সংখ্যা। উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলেও। উভয় পক্ষই সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাত হানছে। এতে কেবল যে প্রাণহানি ঘটছে তাই নয়, শত শত কোটি ডলারের সামরিক অস্ত্রও ধ্বংস হচ্ছে। যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলে। পরিস্থিতি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে।
ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। রেড ক্রিসেন্টের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে নিহত বেড়ে ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত মোট ৫০৪টি স্থান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। আর নথিভুক্ত হামলার সংখ্যা ১০৩৯–এ পৌঁছেছে। গতকাল তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালানোর কথা বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। একইদিন ইরানের ৭ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে তেহরান। লেবাননেও হামলা তীব্র করেছে ইসরায়েল। দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলি হামলায় ৫২ জন নিহত হয়েছে এবং বোমাবর্ষণ পরিস্থিতিতে বৈরুতের শত শত বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। ইসরায়েলের অপরাধমূলক আগ্রাসনের জবাবে তিনটি ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান–সমর্থিত জঙ্গি গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন হামলায় অন্তত দুই ডজনের মতো মানুষ নিহত হয়েছে বলে ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে। গতকাল মধ্য ইসরায়েলেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। কুয়েতের শুইবা বন্দরে ইরানি হামলার ঘটনায় নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলেও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। কাতারে অবস্থিত উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রেডার ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। ইরানের কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রেডার ‘এএন/এফপিএস–১৩২’ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত হামলায় ১১০ কোটি ডলার মূল্যের এই বিশাল রেডার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ড্রোন হামলা হয়েছে। এছাড়া বাহরাইনে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটির প্রধান কমান্ড সদর দপ্তর ইরানের হামলায় ধ্বংস হওয়ার খবর এসেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ ফারস সংবাদ সংস্থার প্রকাশিত ভিডিওতে একের পর এক রকেট বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা গেছে। ফারস এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাহরাইনের শেখ ঈসা অঞ্চলে একটি মার্কিন কমান্ড ও স্টাফ ভবন ধ্বংস হয়েছে এবং জ্বালানি ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
গতকাল ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সব কিছু ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, তাদের এখন নৌ বাহিনী নেই, বিমান বাহিনী নেই, আকাশে বিমান শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, ইরানের নতুন নেতৃত্ব তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাচ্ছে। কিন্তু এখন তিনি ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাবেন না। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলছে, ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইরান ও হিজবুল্লাহর ওপর শক্তিশালী আঘাত হানার কথা বলছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মধ্য ইসরায়েলের একটি বিমানঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আমরা ইরানের ওপর শক্তিশালী আঘাত চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পাইলটরা এখন ইরান ও তেহরানের আকাশে এবং লেবাননের আকাশেও উড়ছে। হিজবুল্লাহকে সতর্ক করে তিনি বলেন, আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহ অনেক বড় ভুল করেছে। আমরা ইতোমধ্যে শক্তিশালী জবাব দিয়েছি। সামনে আরো কঠিন শক্তি নিয়ে মোকাবিলা করব।
তবে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলি বাহরাইনি বলেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা অভিযান ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে, ‘যতক্ষণ না তাদের আগ্রাসন বন্ধ হবে’। জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যদি কোনো প্রতিবেশী দেশের কোনো ঘাঁটি অন্য কোনো দেশে হামলা বা আক্রমণ চালানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে সেই ঘাঁটি ইরানের জন্য একটি বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে। আর ইরানের ওপর হামলাকারী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে থামানো গেলেই যুদ্ধ বন্ধ হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
এদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সারকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ইরানের ওপর এই সামরিক হামলার ‘ঘোর বিরোধী’ বেইজিং। তেহরানের ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ বেইজিং ইতোমধ্যেই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা করেছে। চীন ‘আলোচনা ও পরামর্শের’ মাধ্যমে সমস্যা সমাধান চায়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, শক্তিপ্রয়োগ কখনো সমস্যার প্রকৃত সমাধান করতে পারে না। বরং এটি নতুন সমস্যা ও ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করে। সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সেজন্য চীন অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে। তবে সোমবার সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর গতকাল সাইপ্রাসে নিজেদের সেনা ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন হামলা হওয়ার পর এখন ভূমধ্যসাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে যুক্তরাজ্য।
গতকাল কুয়েত, সৌদি আরব ও বৈরুতে ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ মার্কিন দূতাবাস বন্ধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর তাদের নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ অবিলম্বে ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন। কিছু দেশ থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
যে অজুহাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, সেটি অভিযোগকে নাকচ করে দিল আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। সংস্থাটির প্রধান, মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এনবিসি নিউজকে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইরানের কোনো সমন্বিত কর্মসূচির প্রমাণ তারা পাননি। ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য কোনো সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত কর্মসূচির আলামত শনাক্ত হয়নি। তবে তিনি বলেছেন, তেহরান ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা বেসামরিক জ্বালানি চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিমাণ সংগ্রহ কেবল পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোরই রয়েছে।
ইরানের মেয়েদের একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে দেড় শতাধিক শিশুকে হত্যার ঘটনা তদন্তের কথা বলছে জাতিসংঘ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে স্কুলটি গুড়িয়ে দেওয়া হলেও হামলায় জড়িত কোনো দেশের নামোল্লেখ করেনি সংস্থাটি। স্কুলটিতে ভয়াবহ হামলার তথ্য শেয়ার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ : হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল না করতে সতর্ক করেছেন ইরানের বিপ্লবী রক্ষা বাহিনীর প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাব্বারি। তিনি বলেছেন, ওই পথ দিয়ে যেকোনো জাহাজ যাওয়ার চেষ্টা করলে ‘আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে’। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া বক্তৃতায় জাব্বারি বলেন, প্রণালিটি বন্ধ রয়েছে। এ পথে চালাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে তিনি বলেন, তাদের এই অঞ্চলে আসা উচিত নয়। তারা অবশ্যই আমাদের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে। জাব্বারি বলেন, আমেরিকানরা এই অঞ্চলের তেলের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ইরান এ অঞ্চলে তাদের পাইপলাইনে আঘাত হানবে এবং এই এলাকা থেকে তেল রপ্তানি করতে দেবে না।
বিবিসি লিখেছে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপরিবহন পথ এবং তেল পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ। বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়।